জীবনভগ্নাংশ-ট্রেনে চড়িয়া মর্দ ঢাকা ফিরিল: পর্ব-১

গোটা ষ্টেশন জন সমুদ্র না বাক্স-পোটরা সমুদ্র বুঝা মুসকিল। প্রতিটা মানুষের হাতে ব্যাগ তো আছেই, সাথে নিজের বাড়ী থেকে নেয়া জিনিসপত্রের বস্তা। আর নেবেই না কেন? এই দূর্মুল্যের বাজারে বাড়ীর কিছূ জিনিস নিয়ে যাওয়া খুবই জরুরী। সকল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে কাঙ্খিত সিটে গিয়ে বসলাম। সাধারণ বগির একটা সিট। কপাল খারাপ হলে যা হয়। করিডরের দিকের সিট। আমার সিটের আসে পাশে মোটামুটি সাইলো না হলেও ছোটখাট গোডাউন হয়ে গেল বস্তা দিয়ে। আর সিটের মাথার ধরে ২ জন নারী ও একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে গেল। গরমের কথা আর নাই বা বললাম।

ট্রেন ছাড়ি ছাড়ি করছে। এমন সময় করিডরের সামনের দিকে একটু সোরগোল। এক ভদ্রলোক মাথায় একটা বিশাল ব্যাগ নিয়ে উধর্বশ্বাসে আমার সিটের দিকে আসছে। সাথে স্ত্রী ও ২ কন্যা। তিনি আমার সিট ও পাশের আরো দুটো সিট নিজের বলৈ দাবি করলেন এবং আমাকে সিট ছাড়তে বললেন। চারিদিকে মোটামুটি বিদ্রুপের বন্য বয়ে গেল। বিদ্রুপের লক্ষ্য আমি। ভেবেছে আমি টিকিট বিহীন এবং অন্যের সিট দখল করে বষে আছি। ভদ্রলোক পকেট থেকে টিকিট বের করলেন। আমিও মোবাইলে আমার টিকিটের ছবি বের করলাম। একই টিকিট। সময়, তারিখ, সিট নম্বর সব এক। হালুয়া রুটি দিয়ে খা!

প্রথমে সিট ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করছিল। সিট ছেড়ে এই করিডলে দাঁড়িয়ে আমার পক্ষে ঢাকা যাওয়া সম্ভব না। সুতরাং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বসে রইলাম। ভদ্রলোক প্রথমে অন্য ২’টো সিট দখল করে স্ত্রীকন্যাদের বসার ব্যবস্থা করলেন। এরপর আমার কাছে এলেন। আমি চোয়াল শক্ত করে অপেক্ষা করছি যুদ্ধের জন্য। কিন্তু না, যুদ্ধ জমলো না। তিনি আমার বয়স, পোষাক, ব্যাগ ইত্যাদি দেখে বললেন, আমাকে মাঝে মাঝে বসতে দিয়েন। তাহলেই হবে। যুদ্ধের জন্য যত শ্বাস, রাগ, ইত্যাদি জমা করেছিলাম বুকে, এক লহমায় হুহু করে বুক চিরে বেরিয়ে গেল। হাত মিলিয়ে তাকে প্রথমেই বসতে বললাম। তিনি বিনয় দেখিয়ে বললেন, কন্যাদের সাথেই বসি। যখন সমস্যা হবে, তখন বসতে আসবো।

পালা করে উঠা বসার যাত্র শুরু হলো। অভাগা…… সাগর শুকায়। গদাই লস্করের মত করে আমাদের ট্রেন চলছে। আধা ঘন্টার মধ্যেই একটা ক্রসিং এর জন্য ২০ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলো। আবারও কিছু দুর যাবার পর ক্রসিং। এভাবে আরো দুবার ক্রসিং পার করে যমুনা ব্রীজের পশ্চিত তীরে এসে যেন আস্ত গেল। পাক্কা একঘন্টা পর ট্রেন ‘হুত’ করলো। যমুনা পার হয়ে সোজা জয়দেবপুর। এবপর এয়ারপোর্ট ষ্টেশন।

বিপুল উত্তেজনা নিয়ে উঠেছিলাম ট্রেনে। এয়ারপোর্টে যখন নামলাম, পা টেনে কোন রকমে একটা সিএনজিতে উঠে বাড়ী এসেছি। জেদের ভাত নাকি মানুষ কুত্তা দিয়ে খাওয়ায়। আমিও বুড়ো বয়সে নিজের উপর জেদ করে, নিজেকেই ……… দিয়ে খাওয়ালাম। কান ধরিনি, তবে প্রতিজ্ঞা করেছি, জেদ করবো কিন্তু……. করবো না। রাজশাহী এই জেদ ভ্রমনে আমি যে ব্যক্তির ঘাড়ে সওয়ার হয়েছিলাম, তিনি হলেন আমার সহকর্মী Nazmul Huda । সকল ধরণের আবদার তিনি অম্লান বদনে সহ্য করেছেন। সবকিছুর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ নাজমুল। আরেকবার জেদ উঠার আগ পর্যন্ত ভাল থাকবেন, সবাই, আমিও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top