জীবনভগ্নাংশ-টেবিলের চেয়ে নলি বড়

‘বাঁশের চেয়ে কঁঞ্চি বড়, শব্দটা আমরা অহরহ ব্যবহার করে থাকি। অনেকের আচরন দেখে আমরা টিপ্পনি কেটে এটা বলে থাকি। এই উদাহরণটা সাবলিল ভাবেই অনেকের আচরণে খাপে খাপে মিলে যায়। আজকে যে কারণে এই অসাধারণ প্রবচন আমার মনে পড়েছে, তার সাথে এটার মিল হয়ত অনেকেই খুঁজে পাবেন না।

সারাদিন মাঠে কাজ করে বিকেল ৪টার দিকে খাবারের সময় হল। খাব কোথায়, খাব কোথায় ভাবতে ভাবতে এক বন্ধুর কথা মনে পড়লো। সে জবেদের হোটেল এর কথা বলেছিল। গাড়ি ঘুরিয়ে অবশেষে উপস্থিত হলাম জবেদের হোটেলে। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি ছিল। হোটেলের কাছে গিয়ে একটু অবাক হলাম। অতি সাধারণ মানের একটি হোটেল। তিল ধারণের ঠাঁই নাই। চেয়ার খালি নাই। চেয়ারের দখল নিতে হবে। তাই একটা চেয়ারের মাথায় হাত রেখে দাঁড়ালাম আর টুলটুল করে চেয়ে থাকলাম সেই চেয়ারের বর্তমান মালিকের প্লেটের দিকে।

ভদ্রলোকের প্লেট খালি হয়েও খালি হয় না। আবার ভাত তরকারির অর্ডার দিলেন। অন্য কোন চেয়ারের মাথায় হাত রাখার অবস্থা নেই। কেউ না কেউ সেই চেয়ারের দখল নেবার জন্য মুখিয়ে আছে। মিনিট বিশেক পর ভদ্রলোকের উদর পূর্তির সময় হল। হাত ধোবার জন্য উঠে দাঁড়াতেই এঁটো প্লেট সামনে নিয়েই চেয়ারের দখল নিলাম। চারজনের টেবিলে ৫ জন বসার ব্যবস্থা রেখেছে। অন্যান্যরা উঠে দাঁড়াতেই বিদ্যূৎ বেগে দখল হয়ে গেল অন্যান্য চেয়ার।

টেবিল পরিস্কার করার পর জানা গেল ভাত শেষ হয়ে গেছে। অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুখায়। সুতরাং ভাত আসার আপেক্ষায় বসে রইলাম। একজন জিজ্ঞাসা করলেন-

-মাংশ খাবেন না নলি খাবেন? একটু অবাক হয়ে তাকাতেই বললেন,” নলি আলাদাভাবে পাওয়া যায়”।

‘নলি’ শব্দটি অন্তরের লুকায়িত একটি আকাঙ্খার শব্দ। ছোটবেলায় থালার উপর নলির মজ্জা বের করার ঠক ঠক শব্দটি দিব্যি শুনতে পেলাম্

– নলিই দেন।

উনি বললেন,” এদিকে আসেন, কোন নলি খাবেন, ঠিক করে দেন” একটা বড় হাড়ির মধ্যে থরে থরে সাজানো নলি।

-এটা ৩৫০ টাকা, এটা ৫০০ টাকা, এটা ৮০০ টাকা, একটা একটা নলি দেখাচ্ছেন আর তার দাম বলে যাচ্ছেন। দাম শুনে একটু দমে গেলাম। পরে ভাবলাম খরচ হয় হবে, ছোটবেলার নলির ঠক ঠক শব্দটা আবার আমি শুনতে টাই। একটা নলি নির্ধারন করে তারাতারি টেবিলে ফিরে এলাম। চেয়ার যদি বেদখল হয়ে যায়।

ভাত এলো, এরপর এলো কাঙ্খিত সেই নলি। চারজনের টেবিলে পাঁচজন বসেছি। ভাতের থালা আর মাংশের বাটিতে গোটা টেবিল সয়লাব। নলি রাখার জায়গা নেই। তখনই মনে পড়লো,”টেবিলের চেয়ে নলিই বড়…………….। রান্নাটা ভাল, ঠক ঠক শব্দ দারুন তৃপ্তি দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top