ধীরে ধীরে কখন যে হাতের নাগালে এসে দাঁড়িয়েছিল, টেরই পাইনি। ক্যামেরার স্ক্রিনে চোখ গুঁজে কাজ করছিলাম, হঠাৎ হাতে নরম কিছুর স্পর্শ। চমকে তাকিয়ে দেখি, একটি ছোট্ট বাছুর, আদর পাওয়ার আশায় আমার হাতে মুখ ঘষছে। কাজ থামিয়ে দেওয়ার সাধ জেগে উঠল; মনে হচ্ছিল, ওকে কোলে তুলে নেই।
ময়মনসিংহে ভিডিওর কাজে এসে অদ্ভুত, মায়ামাখা কিছু মুহূর্ত জড়িয়ে গেল জীবনের সাথে। এক নারী, যিনি সতেরো বছর ধরে দৃষ্টি হারিয়েও অবলীলায় সামলে নিচ্ছেন সংসারের যাবতীয় কাজ। আর পাশে দাঁড়িয়ে নবজাত গো-ছাবকটি, আমার গা ঘেঁষে উষ্ণতা চাইছে।
বাছুরটির উষ্ণতা যেন হাতে নয়, মনেও স্পর্শ ফেলছিল। দেড় দিনের জীবনের যে নির্ভেজাল নিষ্কলুষতা, তা এমনভাবে এসে জড়িয়ে ধরেছিল যে মুহূর্তটা হঠাৎ করেই অন্যরকম হয়ে উঠল। তার শরীর থেকে ভেসে আসছিল অদ্ভুত গন্ধমাখা এক আশ্বাস, যেন জন্মের পর পৃথিবীর প্রথম বন্ধুত্ব সে আমার সঙ্গেই করতে চায়।
হাতটা তার গলার নিচের নরম পশমে রেখে অনুভব করলাম, নবজীবনের নরম উষ্ণ দোলা, যেন দুনিয়ার সমস্ত নিষ্পাপতা একটি ছোট্ট শরীরে গুটিসুটি মেরে আছে। সে আরও কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল, মাথাটা সামান্য তুলে দিল, যেন বোঝাতে চাইছে, “আমাকে একটু আরেকটু আদর করো।” তাতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো চাওয়ার ভার নেই; শুধু এক নিঃশর্ত, নিরভিমান উপস্থিতি।
সেই মুহূর্তে মনে হলো, আমরা বড় হয়ে কত কিছু হারাই, স্নেহের সরলতা, স্পর্শের সহজ সত্য, কাছে আসার বিনয়ী আবেদন। অথচ এই ছোট্ট প্রাণীটি, যে পৃথিবীকে এখনো পুরো বুঝে ওঠেনি, সে অনায়াসেই শিখিয়ে দিল স্নেহের মৌলিক ব্যাকরণ, উষ্ণতা মানে আশ্রয়, আর নিষ্পাপতা মানে নিঃশর্ত আস্থা।
আমার কাজের তাড়া ছিল, সময়ের চাপ ছিল, তবু এর মাঝেই বাছুরটির সেই নরম উষ্ণতা আমাকে থামিয়ে দিল একটুখানি। মনে হলো, জীবনে যদি কিছু সত্যি স্পর্শ করা যায়, তবে এমনই কোনো মুহূর্তে, যেখানে কর্তব্যের পাশেও জায়গা করে নেয় অনুভূতির ক্ষুদ্র কিন্তু গভীর আলোর শিখা। এই উষ্ণতা, এই সরল নিষ্পাপ ঘেঁষে দাঁড়ানো, এগুলোই হয়তো জীবনের সেই সূক্ষ্ম সৌন্দর্য, যা ছবিতে ধরা যায়, কিন্তু পুরোপুরি বলা যায় না। শুধু অনুভব করা যায়,হৃদয়ের নিরিবিলি কোনো কোণে।
Photo: Saeed Ahmed Siddiquee