জয়া-অনেকেরই প্রিয় অভিনেত্রী। বিশাল সেলিব্রেটি। আমারও প্রিয়। তবে আমি তাকে ভালোবাসি পর্দায়-বাসার রান্নাঘরে নয়। তিনি কোন চরিত্রে কতটা ভেঙেছেন, গড়েছেন-সে হিসাব রাখি। কিন্তু তিনি সকালে কী খান, বিকেলে কী মেশান, রাতে কোন চামচে নাড়েন-এসব আমার জীবনের খাদ্যচক্রে ঢোকার কথা ছিল না।
কিন্তু জীবন বড়ই দুষ্টু-যা না চাই, সেটাই প্লেটে এসে পড়ে।
এক বন্ধু ফোন করে উত্তেজিত কণ্ঠে জানালো-“জয়ার একটা রেসিপি নেট দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে!” আমি কেঁপে উঠলাম। রেসিপি? জয়া? কাঁপুনি?
শুনলাম-খুব সাধারণ এক পদ। টকদই আর ঝাল চানাচুর। দুই স্বাদের দুই নাগরিককে এক প্লেটে এনে জোর করে সহাবস্থান। রোজার দিন। ইফতারের টেবিলে জায়গা ফাঁকা। কৌতূহল নামক এক আজব প্রাণী আমার ভেতরে লাফালাফি শুরু করলো। বানালাম।
প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে মুখে দিলাম। খারাপ লাগার কথা নয়। টকদইয়ের টকের ভেতর দিয়ে চানাচুরের ঝাল মাঝে মাঝে মাথা তোলে-যেন প্রতিবাদী মিছিল। কিন্তু… কিছু একটা নেই।
খাবার অখাদ্য নয়, কিন্তু আমার রসনাবিলাসে এটি যেন ভোটই পায় না।
আমি হা করে বসে রইলাম।
(আমি এমনিতেই হা করে থাকি-জীবন আমাকে সে অভ্যাস শিখিয়েছে।) সাদা টকদইয়ের বুকে হলুদ চানাচুর-রঙের কম্বিনেশন মন্দ না। শিল্পীসত্তা খুশি। কিন্তু পেট? পেট ভীষণ নির্দয় সমালোচক। নষ্টও করা যাবে না। রোজার খাবার-এখানে অপচয় মানেই পাপ।
ঠিক তখন মনে পড়লো-নিমাই বাবু বা কোন এক উপন্যাসের বাবুর্চির কথা। স্বাদ খারাপ হলে তিনি নানাকিছু মিশিয়ে নতুন নাম দিতেন। বাবুর্চি হিসেবে আমিও কম যাই না। জীবনে অনেক স্বাদহীন পরিস্থিতিকে নতুন নামে চালিয়ে দিয়েছি।
সুতরাং সনাতনী পথে হাঁটলাম।চিড়া ভিজিয়ে ঢাললাম। কয়েক কোয়া কমলা। একটা কলা।
একটা জিলাপি ভেঙে চুপচাপ মিশিয়ে দিলাম। আহা! এই তো! এই তো পরিচিত স্বাদ!
আমাদের মায়েরা ইফতারে চিড়া–দই–আপেল মেখে দিতেন। সেই স্বাদে কোনও “ভাইরাল” ছিল না, কোনও “রেসিপি রিল” ছিল না। তবু আজও মনে পড়লে বুকের ভেতর কেমন শিহরণ হয়। কিন্তু তখন কেউ মাতামাতি করেনি। এখনও করবে না। কারণ মায়েরা ছিল আটপৌরে। আমিও আটপৌরে।
পেটে খিদে আছে- সুতরাং রান্না রান্নাই করতে হবে। কেউ লাইক দিলো কি দিলো না, তাতে আমার কী এসে যায়? আমার পেটের মাতামাতি থামানোর জন্য- এই মুহূর্তে আমি-ই সেলিব্রেটি।