ছবি তুলতে এগিয়ে গিয়ে আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম,“আপনার একটা ছবি তুলতে পারি?”
উত্তরটি এল অন্য কারও কণ্ঠে, “তিনি তো চোখে দেখেন না।” বাক্যটি যেন বাতাসকে মুহূর্তেই ভারী করে দিল। ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে রইলাম স্তব্ধ হয়ে। ভাবলাম, ছবি তোলা কি ঠিক হবে? কিন্তু তাঁর কাজের ভঙ্গিটি এমন নিবিষ্ট, এমন আত্মবিশ্বাসে ভরা যে আমি নিঃশব্দেই পাশে বসে গেলাম।
উনার নাম রূপজান। তুষ ঝাড়ছেন। আঙুলে আঙুলে দানা বাছছেন।
যে কাজ চোখের তীক্ষ্ণতা চায়, তিনি করছেন শুধু শ্রবণ আর অনুভূতির জোরে। পাশের মানুষটি বললো, “শব্দেই সব বলেন উনি। কুলায় ধান নড়ার শব্দ শুনেই চাল-তুষ আলাদা করে ফেলেন। সতেরো বছর ধরে এমনই করছেন।”
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকালাম। আলোহীন চোখ দু’টি বন্ধ, তবু পুরো মানুষটি যেন আলো ছড়িয়ে আছে। অথচ আমরা, যারা দেখার ক্ষমতা রাখি, কত অজুহাত সাজিয়ে রাখি নিজের অক্ষমতা ঢাকতে! আজ সময় নেই, কাল সুযোগ নেই, কখনো পরিবেশ ঠিক নয়।
রূপজানের চোখে দৃষ্টি নেই,
তবু তিনি নিজেকে কাজে ধরে রেখেছেন। শুধু নিজের জন্য নয়,
সমাজ, পরিবার, জীবন যেন তাকে বোঝা মনে না করে, এই নীরব তাগিদেই তিনি এগিয়ে চলেন।
অফিসের কাজে ময়মনসিংহের খাগডহর ইউনিয়নের কালিকাপুরে গিয়ে এই দৃশ্য হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়। মনে হলো, জীবন কথামতো চলে না, জীবন চলে তার নিজের পথে। সে পথের বাঁকে কখন কাকে কী শিক্ষা দেবে, তা আমরা কেউই জানি না।
তবু আমরা বড়াই করি, অভিযোগ করি, অজুহাতের পাহাড় গড়ি।
আর রূপজান? তিনি নীরবে প্রমাণ করে রাখেন, মানুষ আলো দিয়ে নয়, মন দিয়ে পথ খুঁজে নেয়।