জীবনভগ্নাংশ-প্রিয় শুকতারা: পর্ব-৩

রঙধনুর রঙে আলপনা আঁকা তোমার ঠোঁট আমার কখনো ভালো লাগেনি। তার মধ্যে হয়ত অভিনয় ছিল না, ছিল এক বাহ্যিক সৌন্দর্যের ভান। গ্রীষ্মের দুপুরে স্নিগ্ধ জলে স্নান শেষে নিরলংকার আটপৌরে ভেজা ঠোঁটের যে সহজ দীপ্তি, সেই অনাড়ম্বর সৌন্দর্যই আমাকে টানত সবচেয়ে বেশি।

দরজা খুলে কখনও অপেক্ষার কালো ম্লান চোখ দেখতে পাইনি, তবু সেই ইচ্ছা বহুবার হৃদয়ের ভেতর আলোড়ন তুলেছে। ইচ্ছা থাকলেই যে দেখা হয়, তা তো নয়। কিছু দেখা হয় ভাগ্যের ইশারায়, কিছু দেখা হয় সময়ের দয়ায়, আর কিছু দেখা হয় শুধু মনের গোপন জানালায় যেখানে চোখ নয়, অনুভবই সাক্ষী থাকে।

আমাদের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলোকে একত্র করে একটি মালা গেঁথে গলায় পরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে করত প্রতিদিন, যদি রাগ হয় তোমার, দেয়া হয়নি কখনও। ভালোবাসা যত নীরবই হোক, তারও আছে নিজের আলো, নিজের রঙ, নিজের প্রতিধ্বনি।

অলংকার পুরুষের বানানো এক বাহারি মহিমা, অনেক সময় নারীর নিজস্ব আলোকে ঢেকে ফেলে। আমি চাইনি তোমাকে সেই অলংকারের শেকলে বাঁধতে, দেখতে চেয়েছি তোমাকে নিরাভরণ, নির্মল, আত্মার মতো স্বচ্ছ।

তবুও যে অলংকারগুলো (রেশমী চুড়ি, নূপুর) কবিতার ছন্দে শব্দ হয়ে তোমার আগমনের বার্তা দেয়, তোমার শরীরের গন্ধ ছড়িয়ে দেয়, সে অলংকার আমার প্রিয়। তার আভায় থাকে তোমার উপস্থিতি, তোমার গন্ধ, তোমার অদেখা হাসির প্রতিধ্বনি।

রাত গভীর হলে জানালার পাশে বসে ভাবি, তুমি কি কোথাও, দূরের কোনো জানালার ধারে বসে

আমার কথা ভাবো? হয়তো না (ভাববেই বা কেন?)। হয়তো আমি তোমার আকাশের এক নামহীন তারা, যাকে তুমি দেখো না, জানো না, তবু সে জ্বলে, শুধু রাতটাকে একটু আলোকিত করার আশায়। তোমার নাম উচ্চারণ করতে ভয় পাই। নামের উচ্চারণে যদি দূরত্ব আরও বেড়ে যায়? আমি তোমাকে ডাকি নিঃশব্দে, বাতাসের সুরে, বৃষ্টির গন্ধে, অথবা হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা কোনো নীরব দীর্ঘশ্বাসে।

ভালোবাসা এক অদৃশ্য স্পন্দন, যা দূরত্বের ভেতর দিয়েও জেগে থাকে, জ্বলে, নিভে না।

তুমি ছিলে আমার কাছে সেই নিঃশব্দ আলো, যার উষ্ণতা কখনও তীব্র হয়নি, হৃদয়ের কোনো এক কোণে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বলেছে, অদেখা, অথচ অমলিন।

যদি কোনোদিন দেখা হয়-অকস্মাৎ, অপ্রত্যাশিত কোনো সকাল, বিকেল বা সন্ধ্যায়

আমি কিছুই বলব না, অনেক কিছু কিছুই চাইব না। শুধু তুমি যেন একবার হাসো, একটা ছোট্ট, নিঃশব্দ হাসি।

তোমারই কালপুরুষ

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top