তালা খুলে হোটেল কক্ষে ঢুকতেই ‘কারিব কারিব সিঙ্গেল’ সিনেমার আশ্রমের দৃশ্য হয়ে গেল। ঘরের মাঝখানে আরেকটি খোলা দরজা। এপাশে আমি ইরফান খান হয়ে গেলাম। ওপাশে একজন নারী (পার্বতী )দাঁড়িয়ে আছে। হতভম্ব হয়ে বেক্কলের মত হা করে দাঁড়িয়ে আছি। উনি মৃদূ হেসে হাই বলে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি পড়ি কি মরি ছুটে গিয়ে এপাশ থেকে দরজাটা লাগিয়ে দিলাম। বোলপুরের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখতে এসে প্রথমেই শক্তিশেল ধাক্কা। প্রবলবেগে স্মৃতি হাতড়ে সেই গানের কথা মনে করার চেষ্টা করছিলাম। যে গান শুনতে গিয়ে অঘটন ঘটেছিল। মনে পড়ল “বড়ে আচ্ছে লাগতে হ্যায়, এ ধরেতি, এ নদীয়া, এ রাইনা ওর তুমমমমম।
গত ২/১ বছর ধরে ঘর পালানো এবটা অভ্যাস হয়ে গেছে। যদিও এটা পালানো নয়। ঘর ছেড়ে বের হলেও চিন্তা করার কেউ নাই। তাই এটা পালানো নয় বরং উল্টাপাল্টা বের হয়ে পড়া। এবছরের বর্ষায় চেরাপুঞ্জি যাব বলে স্থির করেছিলাম। জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে হয়ে উঠেনি। তাই রবীন্দ্র ভারতীর উদ্দেশ্যে এক দৌড়ে বেনাপোল পার হলাম। এখান থেকে ট্যাক্সি ছাড়া সরাসরি বোলপুর যাবার ব্যবস্থা নেই। ট্যাক্সিতে অনেক টাকা। তাই ট্রেনেই যাবার চিন্তা করলাম। বনগাঁও হয়ে শিয়াদহ, সেখান থেকে ট্রেনে বোলপুর। বন্ধুদের কাছ থেকে কিছূ টিপস পেয়েছি কম খরচে ভ্রমনের।
অভাগা যে দিকে চায় …..শুকায়। বনগাঁও থেকে ট্রেন ১ ঘন্টার বেশী লেট করলো। ফলে শিয়াদহে গিয়ে কানেকটিং ট্রেন হাতছাড়া হয়ে গেল। শিয়ালদহ থেকে এক দৌড়ে হাওড়া। ট্রেন লাইনের কাজ হচ্ছে। তাই দুপুরের সুপার এক্সপ্রেস ট্রেনটি বাতিল হয়েছে। অবশেষে তিনটার ট্রেনের টিকিট কেটে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। অন্তত বিকেল পাঁচটা না হোক ছয়টায় বোলপুর পৌঁছতে পারবো। ট্রেনের দেরী আছে। কিছূ একটা খেয়ে টাকা ভাঙ্গানোর জন্য বেড়িয়ে পরলাম। আশেপাশে কোথাও মানি এক্সচেঞ্জার নেই। একজন বললো,” ফেয়ারলী লঞ্চে করে নদীর ওপারে গেলেই টাকা ভাঙ্গানো যাবে”। চড়ে বসলাম ফেয়ারলী লঞ্চে। ওপাড়ে গিয়ে নানান জনের কথাশুনে ঘন্টাখানেক ঘোরাঘুরি করে বিফল মনোরথে হাওড়া ষ্টেশনে ফিরে এলাম।
আজ যেন ইন্ডিয়ার সকল মানুষ হাওড়া ষ্টেশনে হাজির হয়েছে। লোকে লোকারণ্য ষ্টেশনে অনেক কষ্টে কাং্খিত ট্রেন খুঁজে পেলাম। ট্রেনের দরজা দিয়ে ঠেলাঠেলি করে মানুষ উঠছে। মনে পড়ে গেল আনন্দ সিনেমা হলে ঠেলাঠেলি করে টিকিট কাটার কথা। সেই স্মৃতি মনে করে অনেক কষ্টে একটা বগির দরজায় দাঁড়ানোর যায়গা পেলাম। ট্রেন ঘন্টা খানেক উর্দ্বশ্বাসে চলার পর জানতে পেলাম, এই ট্রেন বোলপুর যাবে না। হা কপাল! ট্রেনের প্রায় সকল যাত্রির হাতে মোবাইল ফোনে ট্রেনের এ্যাপস আছে। তারা মূহুর্তে মূহুর্তে আপডেট জানাচ্ছে। কয়েকজন মিলে তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করার চেষ্টা করলো। একটা যুবক বললো,”আমিও বোলপুর যাব, আপনি আমার সাথে যেতে পারেন। বন্যার তোড়ে ভেসে যাওয়া মানুষ যেভাবে খড়কুটো আকড়ে ধরে, আমিও তাকে আঁকড়ে ধরলাম।
বর্ধমানের আগে একটা ষ্টেশনে আমরা দুজন নেমে পরলাম। একটু পর ট্রেন এল। মোটামুটি বসার সিট পেলাম। কোন সমস্যা হলো না। কিন্তু ট্রেন লাইন মেরামতের কাজের জন্য থেমে থেমে অবশেষে রাত নটায় বোলপুর রেল ষ্টেশন। ষ্টেশনে নামতেই বেহে উঠলো,”ভালবাসি ভালবাসি, এই সুরে কাছে দূরে জলে স্থলে বাজায় বাঁশি”। গানটা শুনতেই সারাদিনের সকল কষ্ট, ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। তারপরই বেশ খোঁজাখুজির পর সেই হোটেল কক্ষ।
চলবে….