এবার ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এল। চেনা পথেই ফিরে আসা। কড়ই গাছটাকে একবার ছুঁয়ে দিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। আমার সাথে বুকের মাঝে সোনালী অতীত। সময়ে সময়ে গাছের পাতা ঝরে যায়, কিন্তু অতীতগুলো ঝরে না। বরং প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে। নিরাশার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েনা, আবারো ফিরে আসার ইচ্ছা জেগে থাকে। বুড়ো বয়সে যাপিত জীবনে এই সোনালী অতীত অনেক বড় সম্পদ।
কোন এক ছোট্ট নদীর কাছে যেতে ইচ্ছে করলো। না পাওয়ার কান্না, বেদনার বিন্দুগুলো যেন তার জলের সাথে মিশিয়ে দিতে পারি। চারঘাটের বড়াল নদীটা যৌবন হারিয়েছে অনেক আগেই। এই নদীর বুক চিরে চিরে সোনালী অতীত খুঁজে পাবার চেষ্টা করছে কিছু মানুষ। কিছূ মানুষ জবর দখল করে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ সৃষ্টিতে মগ্ন। খালের চেয়েও ছোট হয়ে যাওয়া বড়ালের কানে আমার কষ্টের কথা তুলতে ইচ্ছে করলো না। তাই অন্য কোন নদীর সন্ধানে মন ছূটাতে ইচ্ছে করলো।
সিএনজি ড্রাইভার বললো, বাঘমারাতে আপনি নদী পাবেন।
-নদীর নাম কি?
– নামটা জানি না, তবে ওখানে একটা নদী আছে। কুছ পরোয়া নেহি। নতুন কোন নদীর নাম পাবো আমি। নতুন কোন নদীর কাছে যাবে। ভাবতেই মন আনন্দে নেচে উঠলো। ভবানীগঞ্জ যেতে না যেতেই পেটে ক্ষুধার উদ্রেক হলো। শরৎচন্দ্রে ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ইন্দ্রের নতুনদা চরিত্রের কথা মনে পড়লো। গঙ্গার বাতাসে তার ক্ষুধার তার ক্ষুধার উদ্রেগ করেছিল। নদীর কাছে যাব ভাবতেই আমারও ক্ষুধার উদ্রেগ হলো। ভবানীগঞ্জ বাজারে থেমে পেটপূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। ঈদের আমেজ শেষ হয়নি। তাই একটামাত্র হোটেল খোলা। সুতরাং যা পেলাম তাই খেলাম।
খাওয়া শেষে আবারো নদীর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো। খুব বেশী দূরে যেতে হলো না। পেয়ে গেলাম নদীটি। খুব বড় নদী না। কিন্তু বর্ষার পানিতে ভরা যৌবনের গান গাচ্ছে। সিএসজি থামিয়ে শুরু হলো ছবি তোলা। নদীর নাম কোথাও দেয়া নাই। কোথায় নাম পাওয়া যায়? ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলাম। একজন নারী পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
-নদীটির নাম কি?
-ফকিন্নি, মৃদু হেসে বললেন। আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম
– কি নাম বললেন?
-আবারো মৃদু হেসে বললেন,” ফকিন্নি” আমি মোটামুটি হা হয়ে রইলাম।
বিশ্বাস হলো না। ব্রীজের উপর থেকে ধীরে ধীরে নেমে গেলাম। পাশের দোকানের এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনিও উত্তর দিলেন, নদীর নাম ‘ফকিন্নি’
-কতদিন ধরে এই নাম?
-আমার বাপ-দাদারাও এই নামেই চেনে।
কোন ইতিহাস পেলাম না। এটুকু জানা গেল আত্রাই নদীর সাথে এর সংযোগ আছে
মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল। যে নদী বুক উজার করে জল দিয়ে আমাদের জীবন বাঁচায়, তার নাম কি করে ‘ফকিন্নি’ হয়। নদীর জীবনও কি মানুষের মত। কাজ শেষ হলেই ছূড়ে ফেল দেয়। শুণ্য হাতে পথে ছেড়ে দেয়। ধীরে ধীরে সিএনজিতে উঠে পড়লাম।
কোন একদিন ফিরে তো যাবই
ফিরে যেতেই হবে সবকিছূ ছেড়ে
যদি কখনও সময় হয়
যেতে চাই তোমার কাছে আর একবার,
তোমার হৃদয় স্পন্দন ছুঁয়ে বলতে চাই
ভালবাসি।
এরপর কোনদিন আমার চোখের জলে
তোমার করতল ভিজিয়ে দেব না।
চলবে–