জীবনভগ্নাংশ-হাত

ক’দিন আগেই ফেসবুকে দিয়েছিলাম আমার হাত আর ক্যামেরার একটি ছবি। আলো-ছায়ার খেলা, লেন্সের ছোঁয়া, সৃজনের নীরব গর্ব—সব মিলিয়ে ছবিটা দেখে আমি নিজেই আপ্লুত হয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই হাতই আমার পরিচয়; সৃষ্টি, স্পর্শ আর সংবেদনশীলতার প্রতীক।

আজ সকালে ঢাকা আসার জন্য খুলনায় গ্রীনলাইন কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়েছি। শহরের ব্যস্ততা মোটামুটি জেগেছে। হঠাৎ চোখে পড়লো, এক প্রবীণ নারী, এক হাতে ক্রাচে ভর করে দাঁড়িয়ে আছেন, অন্য হাতটা বাড়ানো। মুখে কোনো অনুনয় নেই। তাঁর মুখে সময়ের শত শত আঁচড়, যেন পুরোনো এক তেলচিত্র, যেখানে প্রতিটি রেখাই বলে জীবনের দীর্ঘ লড়াইয়ের গল্প। সেই হাতটা নীরব। তবু সেই নীরবতাই আমার ভিতর কাঁপন ধরালো।

মনে পড়লো মায়ের কথা—

“কোন নারী যদি হাত পাতে, সেই হাত ফিরিয়ে দিবি না।”

মা বিশ্বাস করতেন, নারী সহজে হাত বাড়ায় না; কেবল যখন জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই সে কারো সাহায্য চায়। আজকাল অনেক হাত দেখি, যেগুলো ভিক্ষাকে পেশা বানিয়ে ফেলেছে, চেনা যায় তাদের। কিন্তু আজকের এই নারীর তাদের দলের না। তার মুখ জুড়ে আছে কেবল ক্লান্ত সময়ের রেখাচিত্র।

আমি পকেট থেকে দশ টাকার একটি নোট বের করে তাঁর হাতে গুঁজে দিলাম। হঠাৎই মুখের রেখাগুলো একটু খুলে গেল, ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক চিলতে হাসি—নরম, আলোকিত, কৃতজ্ঞতার মতো। হাতের ছবি তোলার অনুমতি চাইলাম। হাত বাড়িয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে মনে হলো, আমার হাতের ছবিটা ম্লান হয়ে যাচ্ছে।

সেই হাসিটা সারা পথ আমার সঙ্গে ছিল। বাসের জানালা দিয়ে যখন খুলনার রাস্তা পিছিয়ে যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সেই হাতটা এখনো হাওয়ায় ভাসছে,একটা আশীর্বাদের মতো, একটা নরম যন্ত্রণার মতো। ভ্রমণ শেষ হয়, কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায়, যেমন থেকে গেছে সেই হাতের আলো, আর আমার মায়ের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। মানুষের পথচলায় সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্যগুলো ধরা পড়ে ক্যামেরায় নয়, ধরা পড়ে হৃদয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top