জীবনভগ্নাংশ-গোবর চাকা, খুলনা

সকালের দিকে হাতে একটু ফাঁকা সময় ছিল। চা খাবার ইচ্ছে হলো—কিন্তু সেই অভিজাত সিটি ইনের চা নয়। ওখানে চা ভালো, দোষটা চায়ের নয়—দোষ গল্পের। সেইসব এলাকায় চা খেতে বসলে মানুষের কথা শুনে মনে হয়, সবাই যেন কফির দেশে জন্ম নেওয়া। গল্প-স্বল্পের এইসব জায়গায় চায়ের কাপ শুধু কাপ, ঝড় তোলে না।

তাই উদ্দেশ্যহীনভাবে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম সিটি ইনের পেছনের এক ছোট্ট চায়ের দোকানে। চিরাচরিত সেই কাপ, ঢিলেঢালা বেঞ্চ, পাশের ভাঙা দেয়ালে রোদ পড়ে আছে, গল্পের আগমন যেন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

ক্যামেরাটা কাঁধে থাকলে বিপদ আছে, বিশেষ করে লম্বা লেন্স। মানুষ ধরে নেয় সাংবাদিক; আর সাংবাদিক মানেই ‘সাহায্য করার লোক’। চায়ের কাপে চুমুক দিতে না দিতেই বয়স্ক এক মামা-ভাগ্নে জুটি হাজির। তাঁদের বাসনা একটাই—অসহায় মার্কা একটা ছবি তুলে দিতে হবে। আর সেই ছবিটা ভাইরাল করতে হবে। ভাইরাল শব্দের এত দাপট যে, মনে হলো ছবির চেয়ে ভাইরাল হওয়াটাই তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কী আর করা! গল্পে মন আছে, ক্লিকে একটু ছাড় দেওয়া যেতেই পারে।

ফটোসেশন শেষে আলাপ জমে উঠল। কথায় কথায় জায়গার নাম বেরিয়ে এলো ‘গোবর চাকা’। খুলনায় ময়লাপোতা আছে শুনেছি, এবার গোবরচাকাও পেলাম। কৌতূহল চরকির মতো ঘুরে উঠল, গোবরচাকা নামই বা কেন?

উত্তর সহজ, গল্প গভীর। কখনো এখানে হাজার হাজার গরু লালন-পালন করা হতো। সকাল-সন্ধ্যা গরুর সারি এই পথ দিয়ে যেত। আর স্বভাবজাত নিয়ম, যেখানে গরু, সেখানেই গোবর। রাস্তা তখন এতটাই গোবরস্নাত থাকত যে মানুষজন হাসতে হাসতে জায়গাটার নাম দিয়ে দিল “গোবর চাকা”। নামটা থেকে গেল, গরুগুলো চলে সেই কবে।

গল্প এগোতে এগোতেই হঠাৎ ধরা পড়ল সত্যিটা, যাঁরা কয়েক মিনিট আগে অসহায় সাজলেন, তাঁদের নাকি এই এলাকাতেই বাড়ি আছে! শুধু তাই নয়, বাড়িতে একখানা পোষা মোরগও আছে। আর মোরগটিও নাকি ‘মডেল’ হতে চায়! আবদার আবার, একটা ছবি তুলতেই হবে, এবার মোরগ-সহ। আমি হাসলাম। গল্পের জন্যই তো পথে নেমেছি। মানুষ, মোরগ, স্মৃতি, সবই গল্পের উপাদান।

ক্লিক! ক্লিক! ক্লিক! চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে এলো, কিন্তু গল্পের উষ্ণতা ঠিকই ছড়িয়ে পড়ল, গোবরচাকার সকালের বাতাসে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top