জীবনভগ্নাংশ-চিঠি

ছোট্ট একটা চিঠি। কয়েক লাইন মাত্র। এইটুকু চিঠি পড়ে স্থানুর হয়ে কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না। অফিসের টেবিল গোছাতে গিয়ে হঠাৎই হাতের মুঠোয় এলো একটি খাম। সোনালী কারুকাজ করা কাগজের খাম—সময়ের বুক চিরে উঠে আসা কোনো স্মৃতির আলো। এত ছোট্ট, অথচ এত ভারী! কয়েক লাইন লেখা মাত্র, কিন্তু অল্প অক্ষরগুলোই আমাকে দীর্ঘ সময় স্তব্ধ করে রেখেছিল। সহকর্মীর ডাকে সংবিৎ ফিরে পেলেও, মনে ভেসে উঠলো বহু বছর আগের কোন এক বিকেল।

২০০৮ সালের কোন এক বিকেল। অফিস থেকে ফিরে আসতেই নিবিড় বললো—

“বাবা, তোমার টেবিলে খাম নেই?”

আমার বাসার ড্রয়ারে রাখা হাতে বানানো খামগুলো সে আগেই চিনে ফেলেছিল। নানা রঙের, নানা কারুকাজে ভরা। সেদিন সে বেছে নিয়েছিল সবচেয়ে সুন্দর খামটি—সোনালী কারুকাজ করা।

“কেন রে বাবা?”

—“মাকে একটা চিঠি লিখেছি। সুন্দর একটা খামে দিতে চাই।”

মায়ের কাছে লিখা ছেলের প্রথম চিঠি, প্রথম প্রকাশ, প্রথম অনুরাগ—তাই হয়ত সবচেয়ে সুন্দর খামে পাঠাতে চাইছিল। আমার কাছ থেকে শুনে শুনে নিজ হাতে লিখল ঠিকানা। আমার জানা ছিলনা কোথায় সে থাকে। তাই মহাখালীর যে বাসায় আমরা থাকতাম সেটাই বলেছিলাম। অসম্পূর্ণ, ঠিকানা কিন্তু সেই অক্ষরগুলো সাজানো ছিল শিশু হৃদয়ের পূর্ণ ভালোবাসা। তারপর চিঠিটি আমার হাতে দিয়ে বলেছিল—“তুমি পোস্ট করে দেবে।”

কিন্তু আমি পারিনি। পূর্ণ ঠিকানা না থাকায় সেই চিঠি কখনো পোস্ট হলো না। ড্রয়ারের কোণে রেখে দিয়েছিলাম। পড়ে ছিল বছরের পর বছর। অথচ কতবার নিবিড় জিজ্ঞেস করেছে—“বাবা, চিঠিটা পৌঁছেছে?” আমি নীরব থেকেছি, উত্তর দিতে পারিনি।

আজ এতদিন পর যখন সেই খাম আবার হাতে এলো, প্রতিটি অক্ষরের আঁচড়ে আমি আবার অনুভব করলাম নিবিড়ের বুকের ভেতরের আলোড়ন। যেন শুনতে পাচ্ছি তার ছোট্ট কণ্ঠ—“বাবা, মাকে চিঠিটা দিয়েছ?”

প্রায় ১৭ বছরের পুরনো ছোট্ট চিঠি আর খামের ভাঁজে জমা সন্তানের ভালোবাসা, মায়ের জন্য প্রথম নিবেদন । ছোট্ট কাগজ, কয়েকটি সরল শব্দ—তবু তাতে সঞ্চিত হয়ে আছে সময়ের অমোচনীয় চিহ্ন, নির্বাক স্মৃতির নদী, আর জীবনের এক গভীরতম কষ্টের উপলদ্ধি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top