ইরাবতির ডাকে সাড়া দিয়ে মংলার পথ ধরলাম। রূপসা থেকে কাটাখালী। এরপর মংলা। স্থানীয় বাসগুলো বারবার ডাকছে। এই বাসগুলো সারা পথ ধরে যাত্রী উঠাবে। তাই মহেন্দ্র খুঁজছিলাম তারাতারি যাবার জন্য। । অবশেষে একখানা পেয়ে আরো কয়েজনের সাথে আমরাও উঠে পড়লাম। সূর্য্য বিদায় বেলায় পশ্চিম আকাশের সাথে রঙ্গিন হাসিতে মশগুল। সেই হাসি জলরাশিও ভাগাভাগি করে বিলিয়ে দিচ্ছে।
চলন্ত বাতাস আমার চুলে খেলা করছে। অসাধারণ একটা অনুভুতি সারা শরীর জুড়ে। মংলার কিছু আগে লোকাল বাসটি আমাদের অতিক্রম করলো। হেলপার আঙুল তুলে দেখিয়ে উপহাসের হাসি হাসলো। আমরাও হেসেই তাদের উপহাসের জবাব দিলাম। অবশেষে মংলা।
সূর্য্য মামা ততক্ষণে বিদায় নিয়েছে। ঈষৎ আলোতে নদীর ঢেউয়ে বিচ্ছুরণ ঘটছে। ইরাবতি রিসোর্ট থেকে আমাদের জন্য নৌকা আসবে। সেই অপেক্ষায় ঘাটে বসে ঢেউ গুনছি। নদী চলমান, তাই হয়ত তীরে বসে থাকতে কোন বিরক্তি আসে না। সময়ের সাথে ধীরে ধীরে আকাশের পাড়ায় তারারা বেড়াতে এল। নদী তীরের আলো ঝলমলে দোকানগুলো তারাদের সাথে মিতালী পাতাতে বাঁধা দিচ্ছে। নৌকায় উঠার অপেক্ষায় রইলাম।
রাত ৮টায় নৌকা এলো। প্রায় অন্ধকারে সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে নৌকা যাত্রা শুরু হল। ইঞ্জিন চালিত ছোট একটি নৌকা। শিক্ষিত মাঝি। তাই বদর বদর বলে নৌকা যাত্র শুরু করলো না। সুনির্মল বসুর কবিতা মনে পড়লো:
নৌকা চলে নৌকা চলে মাঝ-নদীতে অথই জলে।
বৈঠা মারি’ মাল্লা মাঝি ‘বদর বদর’ চেঁচায় আজি,
বদর বদর শব্দের মানে জানি না। গল্প, উপন্যাস বা কবিতায় পড়েছি। এই নৌকায় বৈঠা নেই, মাঝিও নেই, শুধূ হাল আছে। আছে বিরামহীন যন্ত্রের আর্তনাদ। আমরাই গলুইয়ে পা ডুবিয়ে হল্লা করা শুরু করলাম। রাতের অন্ধকারে পশুর নদীতে কিছুই দেখার নেই। হয়ত জোয়ার ছিল। হঠাৎ বড় বড় ঢেউয়ে নৌকা দুলতে লাগলো। ঢৈউয়ের সাথে গলুইয়ের ধাককা। পানি ছলকে উঠে ভিজিয়ে দিচ্ছিল।
আনন্দ পেলেও ভয়ে গলুই ছেড়ে ভেতরে আশ্রয় নিলাম। অথই জলের অঠাঁই নদীতে বেশ কিছুক্ষণ নৌকার দুলুনিতে এপাশ থেকে ওপাশ গড়াগড়ি চললো। অবশেষে সুন্দর বনের দিকে শাখা নদীতে প্রবেশ। একদম শান্ত স্নিগ্ধ জলরাশি। ততক্ষণে আকাশের কালো ক্যানভাসে তারারা মুচকি হেসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
চলবে…