জীবনভগ্নাংশ-নিঃশব্দে মমি হয়ে থাকা দিনগুলো

পিলারের পলেস্তরাগুলো ভালবাসতে ভুলে গেছে। যে আবেগিত চুমুতে এতদিন খাম্বাগুলোকে জড়িয়ে রেখেছিল, নি:শেষ হয়েছে সেই আবেগ। কথা বলার মানুষের আনাগোনা থেমে গ্যাছে কয়েক বছর আগেই। অন্ধকার ভেদ করে জ্বলে না কোন বাতি। নি:শব্দতার মাঝে এখন শুধু জেগে আছে নরম কিছু প্রাণী। নরম তুলতুলে সাদা সাদা ঘুণে পোকা। কুড় কুড় কুড় কুড় অহর্নিশ। কি যে কঠিন ব্রত। তুলতুলে শরীর নিয়ে কঠিন কাঠের ভেতরে রেখে যাচ্ছে সময়ের ছাপ। বছরে চারেক আগে এক মহিয়সী নারী তাঁর শেষ কথা বলোছিল, শেষ পানি পান করেছিল, শেষ নি:শ্বাস নিয়েছিল এখানেই। তারপর ভোরের আলোর সাথে সাথে শেষ করেছিল সবকিছু। সেই ভোরই এই বাড়ির আলোকিত শেষ ভোর ছিল। এরপর থেকে আলোর সাথে অন্ধকার প্রতিদিন আনাগোনা করলেও নি:শব্দের প্রহরগুলো আরো জমাট বাঁধছে। ঘিরে ফেলেছে এই বাড়ীটাকে। সেই সাথে আমাদের শৈশব কৈশোর আর যৌবনের প্রারম্ভের সকল স্মৃতি নি:শব্দের অন্ধকারের পিরামিডে মমি হয়ে গেছে।

৪ বছর আগেও লম্বা চৌচালা এই ঘরটিকে ঘিরে মানুষের আনাগোনার শেষ ছিল না। হাসি তামাশায় ভরে ছিল। ঢাকা ছেড়ে অচেনা মানুষের সাথী হয়ে বাসে করে এই বাড়ীর উদ্দেশেই ছিল যাত্রা প্রতিবার। বগুড়া, সারিয়াকান্দি, হাটের নানা চেনা-অচেনা মানুষের মুখে পেরিয়ে এই দরজায় পা রাখতেই, ইষৎ অন্কারে শুয়ে থাকা মায়ের কন্ঠ জুড়িয়ে দিত সকল যাত্রা পাথের ক্লান্তি।

-ডলার আচ্চু (এসেছিস),

– নিবড়ক (নিবিড়কে) আনছু

নির্মেলেন্দু গুনের হুলিয়া কবিতার সেই পংক্তি ‘কত সহজেই একটি আলিঙ্গনের কাছে বন্দী হয়ে গেলুম।’

শতেক প্রশ্ন, শতেক উত্তর, কথা শেষ হত না। মা চলে যাবার পর এই বাড়ীতে আর কেউ আসে না, থাকে না। আমরাও না। ফ্রিজ, টেলিভিশন, খাবার টেবিল, লাগোয়া শৌচাগার, বাতি, থালাবাসনের ঝনঝনানি মুখর এই ঘর এখন, গভীর অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। আর কিছূদিন পর হয়ত বাস্তসাপ বাঁসা বাধবে। অন্যান্য প্রাণীকুল আবাসন প্রকল্প খুলে বসবে। বাড়ীর সাথে লাগোয়া বাঙালী নদীতেও স্রোতের আনাগোনা নেই। শ্যাওলা জমে পানির রঙ সবুজাভনীল হয়ে আছে। অতি প্রয়োজনের ছোট ছোট নৌকা এ চর ও চর করে বেড়ায়। মাছের সন্ধানে অলস সময় কাটিয়ে যায় কেউ কেউ। মানুষ চলে গেলে, স্রোত থেমে গেলে এভাবেই কিছু কিছু স্থান অলস হয়ে যায়। এই বাড়ীটা্রও জীবনাবসান হয়েছে। এভাবেই অনেক কিছুর আবসান হবে, হতেই থাকবে—

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top