খুলনা শহরে দুপুর পর্যন্ত ঘুর ঘুর করতে হবে। তাই চিন্তা করতে থাকলাম কোথায় যাওয়া যায়। হঠাৎ মনে পড়লো সিমেট্রি রোডের কথা।
– এই রিক্সা যাবেন? সিমেট্রি রোড? শুধু মাথা নাড়লো।
– কত দিতে হবে? আবারও মাথা নাড়লো। দু’বন্ধু পোটলা নিয়ে উঠে পড়লাম।
যাচ্ছে তো যাচ্ছে।কোন কথা বলছে না। আমরা চিনি না। তাই বার বার তাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম। হঠাৎ করে সে রিক্সা থামিয়ে ইশারা করে দেখালো ‘কথা বলতে পারে না, কানেও শোনে না’। রিক্সা থামিয়ে এক দোকানে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি পথ দেখিয়ে দিলেন।
কিন্তু আবারো সেই অবস্থা! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছি না। সাইনবোর্ডে সিমেট্রি রোড লিখাও দেখতে পাচ্ছি না। আবারো থামিয়ে এক ভদ্রলোককে গোটা বিষয় বুঝিয়ে বললাম। তিনি রিক্সাওয়ালাকে বুঝিয়ে বললেন। অবশেষে সিমেট্রিতে। সিমেট্রির উল্টা দিকে ছোট একটি দোকানে চাবি থাকে। সেখান থেকে চাবি নিয়ে কিছুটা সময় সিমেট্রিতে কাটালাম। এরপর কিছুটা সময় সিএসএস কাটালাম।
“প্রেম কানন” নামে এক মন্দিরের সন্ধান পাওয়া গেল। নামের সাথেই ‘প্রেম’ নামক সোনার হরিণের মৌ মৌ গন্ধ । নিমিষেই পছন্দ হল মন্দিরটি। একটা রথ। চারিদিক ঝকঝকে পরিস্কার। দু’জন পুজারী পুজার ফুল সাজিয়ে রাখছে। মন্দিরের সাথেই একটা পুকুর। লাল ইটের সিড়ি জল পর্যন্ত নেমে গেছে। সিড়িতে সবুজ শ্যাওলার প্রলেপ। ছোট ছোট মাছগুলি খাবারের আশায় সিড়ির কাছাকাছি ঘুরঘুর করছে।
নিছিদ্র নীরবতা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট সুতা টুনির কলকলে ডাক। চারপাশ গাছপালা ঘিরে রেখেছে। সবুজ গাছের ছায়া জলকে সবুজ করে তুলেছে। জুতা মোজা খুলে শীতল পানিতে পা রাখলাম। নিমিষেই প্রশান্তিতে মন ভরে গেল। বড় একটা গাছে বড় বড় বাদুর ঝুলছে। অনেকদিন ঝুলন্ত বাদুর দেখা হয়নি। আলো ঝলমল শহরে বাদুরের আবাস অনেক আগেই উঠে গেছে।
মাথার উপর সূর্য। তবুও আলো ছায়া। মৃদুমন্দ বাতাস। পুকুর পাড়ে ছড়ানো পুজার ফুল। থেমে থেমে পাখির কলতান। স্তব্ধ পুকুরে বুক থেকে উঠে আসা নিরবতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অথচ বুকের ভেতরে মাতাল হাওয়ার আনাগোনা। নিরবেই ছুঁয়ে যায় অনেক কিছু। পাশে মনে হয় অদৃশ্য মানবীর গন্ধ। সাথে কর্কশ অবজ্ঞা । আমি পিয়াসী হলাম শীতল জলের পুকুরের পাশে। আর পাশে ফুটে থাকা কমলের।
‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না,
শুধু সুখ চলে যায়
এমনি মায়ার ছলনা।’ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চলবে….