ভাড়া করা স্নানঘরে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা শেষ করে আবার বের হলাম। পেটের বয়লারে কয়লার অভাব পড়ে গেছে ততক্ষনে। চারঘাটের শ্রীকৃষ্ণ হোটেলে অনেক দিন খাওয়া হয়নি। একটা সিএনজি নিয়ে সোজা চারঘাট। অনেক চেনা পথে চলছি। পথে সারদা পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, ক্যাডেট কলেজে যাবার রাস্তা দেখে অনেক স্মৃতি ভিড় করলো। শ্রীকৃষ্ণ হোটেলে গিয়ে আক্কেল গুড়ুম। সকালের নাস্তা বানানো হচ্ছে না। ঈদের পরে ক্রেতা কম। সুতরাং নো পরেটা। খাব কি? একটু দূরে ভাই ভাই রেষ্টুরেন্ট। লম্বা লাইন। একটাই মাত্র হোটেল যেখানে সকালের নাস্তা পাওয়া যাচ্ছে। ধৈর্য্য ধরে লাইনে অপেক্ষা করে একটা টেবিলে বসতে পেলাম।
হোটেল বয়কে নাস্তার কথা বলতেই ট্রাফিক পুলিশের মত হাত তুলে থামিয়ে দিল।
-দেরী হবে
– কত দেরী?
– ২০ মিনিট। পেটের বয়লারে আগুন দ্বিগুন হয়ে গেল। পরেটার আশায় দীর্ঘ তপস্বায় বসে গেলাম। অবশেষে কাঙ্খিত খাবার এল হাতে। নাস্তা খেয়ে সোজা আলাউদ্দিন মেমিরিয়াল কিল্ডারগার্টেন গেলাম বাদশা স্যারের সাথে দেখা করতে। স্যারের সাথে বিভিন্ন স্মৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা
এই স্কুলটির দোতালার ছাদে স্যার ৩টি রুম তৈরি করে রেখেছেন। যতবার আমি নিবিড়কে দেখতে গিয়েছি, ততবার সেখানেই থাকতাম।
ঘরগুলোর প্রতি একটা মায়া পড়ে গিয়েছি। ঘরগুলোর সামনেই বিশাল কড়ই গাছ। গাছ ভর্তি কাঠবেড়ালী। সারাদিন দুষ্টুমিতে মেতে থাকতো। সন্ধ্যায় একজোড়া হুতুম পেঁচা কোথা থেকে এসে সারা রাত হুতুম হুতুম করতো। রাতে নেমে আসা শুন্যতার অন্ধকার বারান্দা জুড়ে বসে থাকতো। ঝির ঝির বাতাস কড়ই গাছের পাতাগুলোকে খুব সহজেই ছুঁয়ে যেত।
প্রথম যেদিন এখানে থাকতে এসেছিলাম, ঘরের পাশেই একটা কফিন ছিল। এটাতে করে বাদশাহ স্যারের বাবার মরদেহ বিদেশ থেকে এনেছিল। একদিন চাঁদনী রাতে এই কফিনে শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখেছিলাম। হুতুম পেঁচার ডাক, গাছের পাতায় বাতাসের সরসর শব্দ কিছুটা ভয় ধরিয়েছিল। এখন সেটা নেই। দোতালায় উঠে একটু ঘুর ঘুর করলাম।
স্মৃতিগুলো স্মরণ করার চেষ্টা করলাম। থাকার ব্যবস্থায় একটু পরিবর্তন এসেছে। শীতকালে গোছল করার সমস্যা হতো। তাই গরম পানির জন্য গিজার লাগানো হয়েছে। কোলাহল ছাড়িয়ে কোন একদিন হুতুম পেঁচার সাথে গল্প করতে ইচ্ছে জাগলো। কোন এক পূর্ণিমা রাতে আবারো আসবো এখানে। হঠাৎ করেই একটা দমকা বাতাস। কড়ই গাছের পাতা থেকে আমার শরীর ছুঁয়ে গেল। কোন কোন স্মৃতি অনিঃশ্বেষ ও আবিচ্ছেদ হয়ে থাকে হৃদয়ের মাঝে। শঙ্খ ঘোষের কবিতা মনে পড়লো-,
‘হাত তুলে যে মানুষ সহজেই বলে গেল ‘এসো’
সত্যি কি সে ডেকেছে আমাকে?
জড়ের শরীর নিয়ে পায়ে পায়ে পড়ে থাকে কথা
আমরা সবাই তার বুকের উপর দিয়ে হেঁটে চলে যাই
অর্থহীন’।
চলবে।