এবারের নববর্ষে আমি এক নতুন ভাষার মুখোমুখি হলাম-প্রতিবাদের ভাষা। এ ভাষা উচ্চকণ্ঠ নয়, নয় চিরচেনা স্লোগানের ধারাবাহিক উচ্চারণ; বরং এক নীরব, অথচ তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি। আগে এমন ভাষা ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নই-কিন্তু এবারের বৈশাখে তা যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ছোট ছোট মোটিফে, রঙে, প্রতীকে, এবং অনুচ্চারিত বার্তায়।
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সেই মোটিফগুলো যেন কথা বলছিল। কোথাও আঁকা প্রতিবাদের রেখা, কোথাও বর্ণিল অলংকরণের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সময়ের বক্তব্য। বৈশাখের চিরচেনা উল্লাসের ভেতরেই যেন এক নতুন স্তর যোগ হয়েছে-রাজনৈতিক চেতনার নীরব উপস্থিতি।
তবুও, পরিচিত দৃশ্যগুলো অম্লান। একজন বাবা তার কন্যাকে কাঁধে তুলে নিয়েছেন-মেয়েটির চোখে বিস্ময়, আনন্দ আর রঙের ঝলক। বিভিন্ন রঙে সজ্জিত মানুষজন-কেউ লাল-সাদায়, কেউবা নিজস্ব রঙিন পরিচয়ে-এক উৎসবের চলমান ক্যানভাস হয়ে উঠেছে। কারও হাতে একতারা, কোথাও তার সুরের সাথে মিশে থাকা আরেক বাদ্যযন্ত্র-সম্ভবত সারেঙ্গীর মতো-যার সুর বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের পতাকা উড়ছে, আর সেই চিরচেনা পেঁচা-যেন লোকজ ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে-সবকিছুর মাঝে নিজস্ব উপস্থিতি জানাচ্ছে।
প্রিন্টেড নকশীকাঁথার নকশায়ও গাজীরপট এ এবার ভিন্ন এক আভাস। সেখানে শুধু ঐতিহ্য নয়, সময়ের রাজনৈতিক স্পন্দনও যেন মিশে গেছে। এই সংমিশ্রণ-লোকজ ঐতিহ্য ও সমসাময়িক চেতনার-নববর্ষকে এক নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
ছোট ছোট বৈশাখী বাজারগুলোও ছিল যথারীতি। সেসব দোকানে সাজানো পণ্য-মাটির খেলনা, মুখোশ, পাখা, অলংকার-সবই যেন মনে করিয়ে দেয় এই উৎসবের মূল সত্তা: শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া, সহজে আনন্দ খুঁজে নেওয়া।
আর ছিল ছবিশিকারীদের ভিড়। অসংখ্য মানুষ, ক্যামেরা হাতে, মুহূর্তগুলো বন্দি করতে ব্যস্ত।
আমি নিজেও তাদেরই একজন-এই সময়ের এক নীরব সাক্ষী।
এত ক্যামেরার সমাবেশ দেখে মনে হলো, বাংলাদেশে ক্যামেরার বাজার এখন বিস্তৃত ও জীবন্ত। আর মোবাইল ফোনের ক্যামেরা-তার তো কোনো সীমাই নেই; প্রতিটি হাতেই যেন এক একটি গল্পলেখার যন্ত্র।
সবকিছু মিলিয়ে, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে এবারের ১লা বৈশাখ যেন ভিন্ন এক মাত্রা পেল। এটি শুধু একটি উৎসব নয়—বরং সময়ের দলিল, মানুষের অনুভবের প্রতিফলন, এবং নীরব প্রতিবাদের এক শিল্পিত প্রকাশ।
#১৪৩৩