জীবনভগ্নাংশ-হস্তের ভগ্নদশা

মা বলতো দূর্ঘটনার নাকি হাত-পা নাই। তারমানে হঠাৎ করেই উড়ে এসে জুড়ে বসে কারো ঘাড়ে। এবং যথারিতি তিনি (দূর্ঘটনা) আমার ঘাড়ে সওয়ার হলেন। ‘টেপার হাত একেবারে ভেঙ্গে গেছে’ – ‘দেয়া নেয়া’ সিনেমায় উত্তম কুমারের একটা ডায়ালগ ছিল। সেই ডায়ালগ আমার সঙ্গী হল। দূর্ঘটনায় আমার কাঁধের অংশসহ হাত একেবারে ভেঙ্গে গেল। এক্সরে রিপোর্ট দেখার পর বড় ভাইয়ার ডায়ালগ ছিল –‘কেমনে এমন করে ভাঙ্গলি? বেশ বড় ধরণের অপারেশন করতে হবে’। ‘ভেঙ্গেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’ গাইতে গাইতে হাড়ের টুকরো নিয়ে স্কয়ার হাসপাতালে । ডাক্তার বললেন,” বেশ জঘন্যভাবেই হাড়গুলো উড়ে যাবার জন্য ছুটাছুটি করেছে’। সুতরাং ইস্পাত ও তার দিয়ে ছুটে যাওয়া হাড়গুলোকে বাঁধতে হবে। লখিন্দরের লোহার বাসর ঘরের মত মজবুত না হলেও হাতের খোয়াড়ে হাড়গুলো আটকা থাকবে।

-কি কাজ করেন? ডাক্তার সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন।

– ফটোগ্রাফি, আমি বললাম।

– আরে বলেন কি? ফটোগ্রাফি তো আমার প্রিয়। আমি অবসরে ছবি তুলে বেড়াই, ডাক্তার সাহেব বললেন।

হাতের হাড্ডিগুড্ডি রেখে দু’জনে ফটোগ্রাফির আলোচনায় মেত উঠি। অবশেষে উনি বললেন,’আপনি যাতে ভালভাবে ফটোগ্রাফি করতে পারেন, আমি সেভাবেই আপনার অপারেশন করবো’। আশ্বস্ত হয়ে কেবিনে ফিরে গেলাম।

অপারেশনের প্রস্তুতি হিসেবে সকাল থেকেই খাওয়া বন্ধ। দুপুরের দিকে মহাসমারহে অপারেশনের যাত্রা শুরু হল। ফোনে ছেলে নিবিড়ের সাথে কথা হল।নতুন একসেট জামা পরিয়ে হুইলচেয়ার করে যাত্রা শুরু। ওটি’র (ডাক্তার নাহলেও ওটি’র মানে কিন্তু আমি জানি) সামনে ভাইয়ার সাথে কথা হল। হাতধরে কিছুক্ষণ কুশল বিনিময়। দীর্ঘ সময় অজ্ঞান থাকবো। জ্ঞান তো নাও ফিরতে পারে! দূর্ঘটনার কোন হাত-পা নেই! বিদায় নেবার মত কাছে আর কেউ ছিল না। বুকের কাছের কিছু বন্ধু ফোনে শুভকামনা জানিয়েছে।

অসংখ্য যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো একটি বিশাল ঘর। কোন কোন যন্ত্র আমাকে লাল চক্ষু দেখাচ্ছে। কারো কারো চোখে সবুজ বাতি। ঘরের একদিকে বেশ কয়েকজন রোগী অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে। তাদের অপারেশন হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল ইংরেজি সিনেমার ‘মনুষ্য উৎপাদন’ এর ফ্যাক্টরি। ট্রলি থেকে মুলমঞ্চে স্থানান্তরিত হলাম। মাথার উপর আলোর বন্যা।

অজ্ঞানকারী ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন,’কেমন আছেন”?

বললাম – ভাল নেই, ভাল হবার জন্য আপনাদের হাতে সমর্পন করলাম। আর কিছু মনে নেই। তীব্র ব্যাথা নিয়েই জেগে উঠলাম। আধো আধো বোলে সিস্টারের কাছে সময় জানতে চাইলাম। বললেন-রাত ১০.৩০। দুপুর ৩টায় ওটি’তে ঢুকেছি। এখন রাত সাড়ে দশটা। প্রায় সাড়ে সাত ঘন্টার কোন ঘটনা আমার জানা নেই। রাত ১১টার দিকে কেবিনে দিয়ে গেল। ওষুধের ঘোরে আবারও ঘুমিয়ে গেলাম। এভাবেই কেটে গেল ৩ দিন। অবশেষে ছুটির পালা। মোটামুটি হাতে হারিকেন নিয়েই বাসায় ফিরে এলাম।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top