জীবনভগ্নাংশ-বৈশাখে ফটোগ্রাফারের চান্দি শীতলিকরণ

পহেলা বৈশাখের দিনটাতে ঢাকা শহর রঙে, শব্দে আর মানুষের ঢেউয়ে ভরে ওঠে। চারদিকে লাল-সাদা আর নানা রঙের পোশাক, ঢোলের তালে তালে হাঁটা মানুষের মিছিল, আর ক্যামেরার ক্লিকের ঝিলিক। সেই ভিড়ের মাঝেই আমি আর আমার বন্ধু পিপুল হাঁটছিলাম-কাঁধে ক্যামেরা ঝুলিয়ে।

পিপুল পেশাদার ফটোগ্রাফার। আর আমি-শখের। তবে ক্যামেরা হাতে নিলে শখ আর পেশার ব্যবধানটুকু বেশিরভাগ সময়েই ভুলে যাই। মঙ্গল শোভাযাত্রার ছবি তুলতে তুলতেই আমাদের দেখা হয়ে গেল ববি আর তার বন্ধু মিতালির সঙ্গে। ববি আমার অফিসের ইয়ুথ স্বেচ্ছাসেবী ছিল। আর মিতালি-চোখে কৌতূহল, মুখে হাসি, আর আচরণে একধরনের সহজ স্বাভাবিকতা।

মডেল আর ফটোগ্রাফারের দেখা হলে বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগে না। বৈশাখের রঙিন ভিড়ের মধ্যে লতাপাতার মতো জড়িয়ে গেল একটা ক্ষণিকের বন্ধুত্ব। ববি আর মিতালি শুধু আমাদের মডেল হলো না, সেদিন যেন তারা পুরো উৎসবেরই মডেল হয়ে উঠেছিল। একের পর এক ফটোগ্রাফার এসে তাদের ছবি তুলছে। কেউ কেউ আবার কথা বলছে, ছোটখাটো সাক্ষাৎকারও নিচ্ছে। তাদের দুজনের মুখে তখন অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস-যেন হঠাৎ করেই তারা উৎসবের ছোটখাটো সেলিব্রিটি হয়ে উঠেছে।

অনেকক্ষণ পর আমাদেরও ছবি তোলার সুযোগ এলো। পিপুলের দুষ্টুমি আমি জানি। কিন্তু মিতালি যে ভীষণ রসিক, তা সেদিনই প্রথম টের পেলাম। ববির একটা বিশেষ ভঙ্গির ছবি তুলতে গিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়ে গেলাম। যতই চেষ্টা করি, ঠিক যে মুহূর্তটা চাই, সেটাই ধরা দিচ্ছে না। চারদিকে বৈশাখের গরম বাতাস বইছে। মনে হলো সেই গরমে শুধু পরিবেশ নয়, আমার মাথার চান্দিটাও যেন একটু বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

ঠিক তখনই অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটলো। কোনো কথা না বলেই মিতালি তার ছোট্ট হাতে ধরা ফ্যান বের করে আমার মাথার সেই উন্মুক্ত চান্দির দিকে বাতাস দিতে শুরু করল। যেন সে মনে মনে ঠিক করেছে-ফটোগ্রাফারের মাথা ঠান্ডা না হলে ভালো ছবি আসবে কীভাবে!

আমি একটু লজ্জা পেলাম, একটু অবাকও হলাম। ববি হেসে কুটিকুটি। আর পিপুল-সে তো এমন মুহূর্তের অপেক্ষাতেই থাকে। ক্যামেরার শাটার নরম শব্দে বেজে উঠল।

ক্লিক।

ববির কাঙ্ক্ষিত ছবিটা ঠিক তখনই পাওয়া গেল কি না জানি না। কিন্তু পিপুল যে মুহূর্তটা ধরে ফেলল-সেটা ছিল একেবারে আলাদা। এক রোদঝলমলে বৈশাখী দুপুরে, এক মডেলের হতে ধরা ফ্যান দিয়ে এক ফটোগ্রাফারের চান্দি ঠান্ডা করার দৃশ্য। ছবিটা দেখে মনে হলো-জীবন আসলে এমনই ছোট ছোট হাসির মুহূর্তে ভরা। অচেনা মানুষের সাথে হঠাৎ করে তৈরি হওয়া বন্ধুত্ব, আর সেই বন্ধুত্বের ভেতর লুকিয়ে থাকা সহজ আনন্দ।

পিপুল ছবিটা তুলে অবশ্যই বেশ গর্বিত। আর আমি মনে মনে ভাবলাম- হয়তো কোনোদিন এই ছবির নাম হবে-

“বৈশাখে ফটোগ্রাফারের চান্দি শীতলিকরণ।”

ক্ষণিকের এই বন্ধুত্বের স্মৃতিটুকু রয়ে গেল ছবির ভেতর। আর বৈশাখের বাতাসের মতোই হালকা এক হাসি রয়ে গেল মনে।

জয় হোক এই ক্ষণিক বন্ধুত্বের।

নতুন বছর সবার জীবনে এমনই সুবাতাস বয়ে আনুক।

ফটো: Pipul Nur Hossain

#মঙ্গলশোভাযাত্রা

#পহেলাবৈশাখ

#১৪৩৩

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top