কয়েকটা ইঁদুর মেরে আমি অদ্ভুত এক মানসিক টানাপোড়েনে পড়েছি। প্রয়োজন ছিল-অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বাজারের বিষটোপেও কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত একটা খাঁচা কিনে আনলাম। এ পর্যন্ত তিনটি ইঁদুর নিধন করেছি।
কিন্তু প্রতিবারই কাজটা শেষ হওয়ার পর ভেতরে এক ধরনের অনুতাপ জমে উঠেছে। খাঁচাটা যখন পানির মধ্যে ডুবিয়ে দিই, তখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য ইঁদুরের সেই ছোটাছুটি-সেটা দেখতে আমার আর সহ্য হয় না। চোখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে, তবুও সেই দৃশ্যটা মনের মধ্যে আটকে থাকে। কষ্ট হয়। অকারণ এক ভার নেমে আসে ভেতরে।
আমি গ্রামে বড় হয়েছি। সেখানে গৃহপালিত প্রাণী ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীর প্রতি আলাদা করে দরদ শেখানো হয়নি। বরং উল্টো-গর্ত খুঁড়ে সাপ, ইঁদুর, শেয়াল মারা যেন একধরনের অভ্যাস, কখনও কখনও নেশার মতো ছিল। ফসল বাঁচাতে ইঁদুর মারতেই হতো। সাপ বের হলে ভয়, তাই মেরে ফেলা নিরাপদ। বর্ষাকালে শেয়ালগুলো যখন বাড়ির পেছনের ঝোপে আশ্রয় নিত, তখন দল বেঁধে খুঁজে খুঁজে মারার মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত উল্লাস কাজ করত।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতিগুলো বদলেছে। এখন প্রাণিকুলের প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মেছে। তখনকার সেই গ্রামীণ শিক্ষায় এই মমতা ছিল না-ছিল বেঁচে থাকার প্রয়োজন, ছিল ভয়, ছিল প্রতিরোধ। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতরের প্রতি সবারই ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা, কিন্তু অন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে ছিল নির্মমতা।
এখন মনে হয়-প্রতিটা প্রাণীরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। কিন্তু সেই অধিকার যখন মানুষের ক্ষতির কারণ হয়, তখন মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হয়তো সেখানেই জন্ম নেয় এই নিধনের যুক্তি।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায় এসে দাঁড়ায়-
মানুষ যখন মানুষকে নিধন করে, তার জবাব কী?
কখনও কখনও মানুষ মানুষকেই মায়ার জালে আটকে রাখে। বিশ্বাসের, সম্পর্কের, আশ্রয়ের মায়া। তারপর একসময় তাকে ছুড়ে ফেলে দেয়-ডুবিয়ে দেয় অদৃশ্য কোনো জলে। তখন সেই মানুষটিও প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছটফট করে, শ্বাস নেবার জন্য লড়াই করে-ঠিক সেই ইঁদুরটার মতো, যাকে আমি খাঁচাসহ পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের চারপাশে এমন মানুষের সংখ্যা যেন ক্রমেই বাড়ছে। তবুও আমরা বাঁচতে চাই। খাবি খেতে খেতেই, ডুবে যেতে যেতে, শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ভেসে থাকার চেষ্টা করি।
তারপরও আবার নতুন কোনো মায়ায় জড়াতে ইচ্ছে করে।
নতুন করে বিশ্বাস করতে মন চায়।
এইভাবেই-
মায়ার পর মায়ায় জড়িয়ে,
ছোট ছোট ডুবে যাওয়ার মধ্যে দিয়েই
একদিন নিঃশব্দে শেষ হয়ে যাবে জীবন।