‘বিরহ বড় ভাল লাগে’, শচিন বাবুর গানটি হঠাৎ বড় শুনতে ইচ্ছে করলো। মনে হলো বনভুমির নি:শব্দের সাথে মন মেলাতে হলে বিরহের আগুনে পুড়তে হবে। অথচ কিছুক্ষণ আগেও নৌকার ছইয়ে বসে তারাদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতে নরম হাতের ছোঁয়ার অভাব অনুভব করছিলাম।
রাতের দ্বিপ্রহরের শেষভাগ। সুন্দরবনের প্রকৃতি নি:শ্বব্দের কাঁথা মুড়ি দিয়েছে। নদী জোয়ারের পানি নিয়ে বনের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছে। বেড়াতে এলে তো একটু কল কল শব্দ করবেই। নদীর উপর কাঠের পাটাতনে বসে কল কল শব্দ বড় অদ্ভুত লাগলো। নিজেকে অভিমান শুন্য মনে হল।
ঝলমলে ইরাবতিতে পা দিয়ে বেশ ভাল লাগলো। নদীর একেবারে তীর ঘেষে গোলপাতা আর কাঠের কুঁড়েঘর। বাঁশ দিয়ে বানানো লম্বা করিডর। করিডর দিয়ে হাটতে গেলেই সবুজ গোলপাতার ছোঁয়া। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা শেষে রাতের খাবারে হামলা দিলাম। আগের দিনের গ্রামের রান্নাঘরের মত একটা বড় ঘর। কাঠ, বাঁশ আর বাঁশের বেড়া দেয়া। যদিও প্রকৃতির মাঝে বেড়াতে এসেছি, পোড়া মুরগী পিছু ছাড়েনি। মানুষ পোড়া মুরগীতে বেশ অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে। খাবার শেষেই প্রকৃতির হাতে নিজেকে ছেড়ে দিলাম।
রিসোর্টটি অতিথিতে পরিপূর্ণ। আমার কাছে মনে হল তারা শুধুমাত্র এসেছে। উপভোগ করতে আসেনি। ঘরে বসে চিৎকার করে তাস খেলছে, সিগারেট ফুকছে। কোথায় গিয়ে কি কি পেয়েছে, কি কম ছিল, কি ভাল ছিল ইত্যাদি গলপে মশগুল। জুটিগুলো অন্ধকারে ভালবাসার উৎসের সন্ধানে গুন গুন করে গান করছিল। তবে কেহই আমাদের মত রাতের সৌন্দর্য্য পানে আসক্ত ছিল না। রাতের দ্বিপ্রহর শেষ হতেই পাটাতন খালি হয়ে গেল। স্বার্থপরের মত হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
করিডরের বাতিগুলো ছাড়া সব বাতি নিভে দেয়া হল। অন্ধকার পান করা শুরু হল আমার। পুব আকাশে চাঁদ প্রিয়ার পথের রেখা দেখা দিচ্ছিল। সুতরাং তার সাথে দেখা না করে কি করে ঘরে ফিরে যাই। বাতাসের সাথে কিছু বুনো ফুলে গন্ধ। আমাদের গল্প জমলো না। নিরবতা, বাতাস, অন্ধকার ধীরে ধীরে আমাদের গ্রাস করে ফেললো। কখন যে অন্ধকার ফিকে হয়েছে জানি না। কালো ঘোমটায় অবগুন্ঠিত চাঁদ মাথার কাছে এসে হেসে দিল। বন্ধুরা ঘরে চলে গেল। আমি চাঁদ প্রিয়ার হাত ধরে বসে রইলাম, সূর্যের আদর গায়ে মাখবো বলে।
চলবে…….