জীবনভগ্নাংশ-ট্রেনে চড়িয়া মর্দ ঢাকা ফিরিল: পর্ব-৫

নদীর নাম ‘ফকিন্নি’ কিচুতেই মেনে নিতে ইচ্ছে করছিল না। স্থানীয় একজন বলেছিল ‘রানী’ নামকরণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রানী নামটি প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। আস্তে আস্তে রাজশাহী শহরের দিকে ফিরছি। বিজয়দাকে ফোন করার কথা মনে পড়লো। বিজয়দা রাজশাহী জেলা পুলিশের ডিআইজি। বন্ধু মানুষ। আমরা দু’জনে আমেরিকান অ্যাম্বাসীর আমন্ত্রণে আমেরিকায় গিয়েছিলাম। সেই থেকে আমাদের বন্ধুত্ব। রাজশাহী রওনা হবার আগে ফোন করে জানিয়েছিলাম। উনি সময় দিতে চেয়েছেন।

ঝোক আর জেদের বসে বেড়িয়ে এসেছি। আজ রাতেই ফিরতে হবে। কোথাও কেন টিকিট নেই। ঈদের ছুটির এটাই শেষদিন। সুতরাং না থাকারই কথা। ‘ফকিন্নি’ নদী আমাকে ভিখারী বানিয়ে দিয়েছে। দ্বারে দ্বারে ফোন করে একটা টিকিট ভিক্ষা চাচ্ছিলাম। সবাই ‘মাফ করেন’ বলে রেখে দিচ্ছিল। একজন মানুষ বিপদের বন্ধু হয়ে গেল। মাসুদ ভাই। তিনি একজন কলেজ শিক্ষক। আমার অফিসের একজন গুরুত্বপূর্ণ স্বেচ্ছাসেবক। ওনাকে বলতেই বললেন দেখছি কি করা যায়। অনেক প্রচেষ্টায় তিনি অসাধ্য সাধন করে ফেললেন। ট্রেনের টিকিট একখানা যোগাড় করলেন। সাধারন বগির টিকিট এবং তিনগুন বেশী দামে। কিছু করার নাই। অগত্যা মদুসুদন বলে কিনে ফেললাম।

শহরে এসে মাইডাস বিল্ডিং এর ৫ম তলার একটি রেস্তোরায় বসলাম। বিজয়দাকে আবারো ফেন দিলাম। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেন। রেস্তোরাটা ভালই সাজিয়েছে। আমার খুব পছন্দ হলো। রাজশাহীর সব কিছুই ভাল লাগলো। চমৎকার ভাবে সাজানো হচ্ছে শহরটি। রহমানিয়ার আলুর সিঙ্গারার কথঅ মনে পড়লো। আমি যখন রাজশাহী কলেজে পড়তাম, আমাদের বিকালের নাস্তা ছিল রহমানিয়ার সিঙ্গারা। পঞ্চাশ পয়সার সেই সিঙ্গাড়া সিরকা আর শশা দিয়ে খেতাম। রহমানিয়ার সেই সিঙ্গারা আরেকবার খাইতে ইচ্ছে করছিল। শহরে বেশী ঘুরাঘুরি করার সময় ছিল না।

রাজশাহীতে আমার অফিসের আঞ্চলিক অফিস আছে। সহ কর্মীদের ফোন দিলাম। তারপর একখানা কফি হাতে অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। রাত ১১টায় ট্রেন। হাতে বিস্তার সময় আছে। চুটিয়ে সবার সাথে আড্ডা মারা যাবে। অন্তত ফকিন্নি নামটা মাথা থেকে মুছে ফেলতে হবে। সন্ধ্যা সাতটার পর বিজয়দা এলেন। সাথে আরো ৩ বন্ধু। সবাই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। শুরু হলো আমাদের আড্ডা। তবে বেশীভাগ সময়ই আমেরিকা ভ্রমনের স্মৃতিচারণ। তারপর বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় তুলোধুনো করতে করতেই আমার সহকর্মীগণ চলে এলেন। কফি এলো সবার জন্য। গরম কফি হাতে নিয়ে বাংলাদেশের নানা বিষয় বিশ্লেষণ আবারো শুরু হল। রাজনীতি, অর্থনীতি, সংঙ্গীত, নদী, ফকিন্নি কোন বিষয়ই বাদ পড়লো না। কফি যত ঠান্ডা হচ্ছে, আলোচনা ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। একফাঁকে আমার প্রকাশিত কবিতার বইটা বিজয়দাকে দিলাম। আমার বিদায় নেবার পালা। প্রয়োজনীয় বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে মাসুদ ভাইয়ের আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম।

মাসুদ ভাই ভাবীকে বোধহয় কিছু একটা বলেছিল। ফলে খাবার ভর্তি টেবিলের সম্মুখীন হতে হলো। চমৎকার স্বাদের সকল খাবার, কিন্তু দুঃখ একটাই বয়সটা ভাটির দিকে। পেটের বয়লারে কোন রকমে খাদ্য বোঝাই করে রেল ষ্টেশনের দিকে রওনা হলাম। মাসুদ ভাই নিজে মোটর সাইকেলে করে আমাকে ষ্টেশনে পৌঁছে দিলেন। অসংখ্য ধন্যবাদ মাসুদ ভাই। কিছুটা উত্তেজিত মন নিয়েই ষ্টেশনে প্রবেশ করলাম। । অনেকদিন পর ট্রেনে উঠবো।

চলবে…..

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top