জীবনভগ্নাংশ-সাদাকালো

ইতিহাস মুছে ফেললাম। না, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নয়; সিন্দুকের মাঝের ছোট কাঠের বাক্সে লুকোনো ভোমরার ইতিহাস নয়। কিছু রঙ তুলে ফেলে, সাদাকালোয় নতুন করে কিছু ছবি ধরলাম।

মনোক্রোমে জীবনকে ফিরে দেখার ইচ্ছেয়।

রঙের গল্প আসলে জীবনেরই গল্প। শুরুতে ছিল একরঙা, নিঃশব্দ, সাদাকালো একটা দুনিয়া। শৈশবের সাদাকালোয় রঙ ছিল না ঠিকই, কিন্তু আলো ছিল, সকালের রোদে উঠোনে ছায়া পড়া, বারান্দায় আমপাতার দোল, আর বইয়ের পাতায় সাদা-কালো ছবির মুগ্ধতা।

তারপর কৈশোরে ঢুকে প্রথম প্রথম যে রঙগুলো জীবন ছুঁয়ে গেল, সেগুলো খুব সরল, গোধূলির কমলা, স্কুলব্যাগের নীল, আর বন্ধুত্বের হাসিতে ছড়ানো অদ্ভুত রঙিনতা। সেই রঙগুলো ছিল নিষ্পাপ, দোষহীন, পুরোটাই আলোর মতো পরিষ্কার। ছবি তোলা জীবনে ঢুকে পড়তেই রঙের অভিধান বদলে গেল। প্রথম ক্যামেরা হাতে পাওয়ার দিনটি যেন জীবনের কালার প্যালেটে হঠাৎ করে এক থোকা লাল, এক ফোঁটা নীল, এক রেখা হলুদ এসে পড়ল। নিজের ক্যামেরা, মানে নিজের চোখ, স্বাধীনতা, নিজের দুনিয়া বানানোর ঢেউ।

তারপর এল তারুণ্যের রঙ। যেখানে লালটা একটু বেপরোয়া, নীলটা একটু গভীর, সবুজটা একটু স্বপ্নময়। ভালোবাসার রঙ তখন অনেক গাঢ়, আর হারানোর রঙ অনেক বেশি বিষাদমাখা।

কারও উপস্থিতি জীবনকে হঠাৎ উজ্জ্বল করে দিয়েছে, কারও বিদায় নিভিয়ে দিয়েছে বহু রঙের প্রদীপ। আরেক সময় এসেছে যখন জীবন রঙে ভরপুর, কিছু রঙ খুব চড়া, কিছু রঙ কোমল, কিছু রঙ স্থায়ী, কিছু রঙ কেবলই পথিক। অনেকেই এসেছিল, নিজস্ব রঙ নিয়ে, আর চলে গেছে রঙটাই সঙ্গে নিয়ে। কেউ কেউ “রঙের অযোগ্য” ঘোষণাও দিয়েছে। তাদের কথার ধূসরতা তখন পুরো আকাশ ঢেকে ফেলেছিল।

এখন জীবনের রঙ বদলে গেছে আরেকভাবে। আগের মতো চড়া রঙ নেই, আছে ধীর, শান্ত, অভিজ্ঞ রঙ। পুরনো ফটোগ্রাফের সেপিয়া টোনের মতো। এখন রঙ আসে আলো-ছায়ার ভেতরে, গভীরতা থেকে, নীরবে জমে থাকা আলো থেকে। রঙগুলো এখন আর বাইরে থেকে আসে না। এসে জমা হয় ভেতরে। বছরের পর বছর ধরে অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, ভুল, শেখা, ভালোবাসা, সব মিলিয়ে যে রঙ তৈরি হয়েছে, তা আর কোনো ক্যামেরার ফিল্টারেই ধরা যাবে না।

জীবনের রঙিন পথঘাট পার হয়ে এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি এমন এক মোড়ে, যেখানে আলোটা নরম, রঙটা মোলায়েম, আর সাদাকালোর দিকে এক অদ্ভুত টান। কোনো একদিন চিরতরে সেই মনোক্রম জগতে হারিয়ে যাব- যেখানে রঙ থাকবে না,

কিন্তু আলো থাকবে-সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে স্থির।

Shurana Ahmed ফেসবুকে যার সাদাকালো ছবি দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top